শনিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

সনাতনী শিক্ষা পদ্ধতি থেকে সৃজনশীল পদ্ধতি



আমাদের দেশের শিক্ষা পদ্ধতি হল সেই সনাতনী শিক্ষা পদ্ধতি। একজন শিক্ষক ক্লাশে যান অনুশীলনী ধরে কিছু পাঠ বুঝানোর চেষ্ঠা করেন। তারপর বাড়ীর কাজ দেন। কোমলমতি ছাত্ররা শাস্তি থেকে বাচাঁর ভয়ে না বুঝেই মুখস্ত করে আসে। তাদের জন্য এটা অত্যন্ত বিরক্তিকর একটি কাজ। শিক্ষার প্রতি তাদের আগ্রহ দিনে দিনে প্রায় শূন্যের কোঠায় এসে পৌচেছে। শুধু মাত্র অভিভাবকদের পিড়াপিড়িতে তারা শিক্ষা গ্রহণ করতে আসে। আবার মুখস্ত করতে না পারার ভয়ে অনেক ছাত্র বিদ্যালয়ে নিয়মিত অনুপস্থিত থাকে এবং এক সময় ঝড়ে পরে।

আবার পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে একধরনের ভীতি থাকে (আমার ছিল) মুখস্থ করে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করায় সমস্যা দেখা দেয়। প্রশ্ন কমন পড়ে কি না, সেই দুশ্চিন্তা তাদের তাড়া করে বেড়ায়। ছাড়া নিষিদ্ধ গাইড নোটবই তাদেরকে পাঠ্যবইবিমুখ করে তুলছে। এসব সমস্যা দূর করতে সৃজনশীল পদ্ধতি প্রণয়ন করা হয়েছে। সৃজনশীল পদ্ধতিতে (পাঠ পরিকল্পনা মাফিক) শিক্ষা কিছুটা হলেও আশার আলো দেখাচ্ছে।

পদ্ধতি নিয়ে আমাদের টিচারদের মধ্যেও অনেক দিধা-দন্দ ছিল ট্রেনিং গুলোর মাধ্যমে সেই দিধা দূর হয়ে যাচ্ছে। শিক্ষকরাও বুঝতে পারছেন- পদ্ধতিতে শিক্ষা না দিলে করলে তাদের গ্রহণ যোগ্যতাও কমে যাবে।

যেমন- একজন ছাত্র, যে হাতি দেখেনি তার কাছে হাতির বর্ননা দেওয়ার চাইতে, তাকে একটি হাতির মডেল সংগ্রহ করে দেখালে বা হাতির চিত্র দেখালে তার কাছে সেটি হৃদয়গ্রাহী, উপভোগ্য এবং আকর্ষণীয় হবে। শিক্ষকের দেয়া বর্ণনা মুখস্ত করার চাইতে সে নিজেই একটি বর্ণনা তৈরি করে নিতে পারবে।

এটিই হল সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি। টিচারের দেয়া হাতির বর্ণনা দশজন ছাত্রর মধ্যে দু-জন হয়ত মনোযোগ সহকারে শুনবে বাকি আটজনই ধীরে ধীরে অমোনোযোগী হয়ে পরবে এবং তাদের কাছে শিক্ষকের এই পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের মুখস্থনির্ভরতা থেকে সরিয়ে আনবে।
এসএসসি পরীক্ষায় সৃজনশীল পদ্ধতি নেওয়া হয়েছে। যেকোনো ক্ষেত্রে নতুন একটা পদ্ধতি নেওয়ার সময় খানিকটা বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি হয়। বাংলাদেশে সেটা অনেক প্রকট হওয়ার আশঙ্কা ছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটা সামলে নেওয়া গেছে বলে আমার ধারণা।

অনেক স্কুলের শিক্ষকেরা এখনো পুরোপুরি ব্যাপারটা ধরতে পারেননি। তাঁরা অনেক সময় ছাত্রছাত্রীদের সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করানোর চেষ্টা করেছেন, কিন্তু জাতীয় পরীক্ষাগুলোয় তার কোনো আশঙ্কা নেই। পদ্ধতির কারণে ধীরে ধীরে প্রাইভেট কোচিং উঠে যাবে এবং নোট বা গাইড বইয়ের মৃত্যু ঘটবে। সবচেয়ে বড় লাভ হবে দেশের। কারণ, ছেলেমেয়েরা একটা শাণিত মস্তিষ্ক নিয়ে বড় হবে, যেটি আমরা প্রথমবার ব্যবহার করতে পারব। সৃজনশীল পদ্ধতিতে লেখাপড়া করে যারা বড় হচ্ছে, আমি আগ্রহের সঙ্গে তাদের জন্য অপেক্ষা করছি। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে তারা যখন পৌঁছাবে, আমি জানি, তখন তারা সবাই হবে ক্ষুরধার মস্তিষ্কের বুদ্ধিদীপ্ত সৃজনশীল একটি প্রজন্ম।

আমার কাছে প্রশ্ন এসেছে, এইচএসসিতে সৃজনশীল পরীক্ষা হবে কি না, হলে কতটুকু হবে। এটা কি আদৌ একটা প্রশ্ন হতে পারে? একটি শিশুকে আমি মুক্ত বাতাসে ছুটে বেড়িয়ে বড় হতে দিয়েছি, এখন আমরা কি তাকে অন্ধকার ঘরে তালাবদ্ধ করে রাখব? যে ছাত্রছাত্রীদের সৃজনশীল প্রশ্নে পরীক্ষা দিতে অভ্যস্ত করেছি, তাদের আমরা কি কখনো মুখস্থনির্ভর গতানুগতিক একটা পরীক্ষায় ফেলে দিতে পারি? পারি না।
এইচএসসি পরীক্ষায় অবশ্যই ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে হবে, অবশ্যই সৃজনশীল পদ্ধতিতে তার পরীক্ষা নিতে হবে


বগুড়া সরকারী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়র সহকারী শিক্ষক মো. জুলফিকার আলীবলেছেন,
বর্তমান মাধ্যমিক স্তরের পরীক্ষা পদ্ধতির সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে মাধ্যমিক পর্যায়ে সৃজনশীল প্রশ্ন পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। মাধ্যমিক পর্যায়ে সৃজনশীল পদ্ধতি শিক্ষার ক্ষেত্রে গুণগত মানোন্নয়নের জাতীয় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের একটি কর্মসূচি হিসেবে তাত্পর্যপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে বলে সর্বমহলে স্বীকৃত বিষয় হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। এই পদ্ধতিতে শিক্ষার ক্ষেত্রে ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে। নতুন পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের সৃজনশীল প্রতিভা তথা জ্ঞান, অনুধাবন, বিশ্লেষণ উচ্চতর দক্ষতার বিকাশ ঘটাবে। এই পদ্ধতি নোট বই, গাইড বই বা বিভিন্ন ধরনের সহায়ক বইয়ের ওপর শিক্ষার্থীদের নির্ভরশীলতা থাকবে না। তারা তাদের মেধা মননশীলতা বিকাশের সুযোগ পাবে। সৃজনশীল পদ্ধতি বাস্তবায়নে মূল চালিকাশক্তি শিক্ষকদের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের এগিয়ে আসতে হবে। এই পদ্ধতি বাস্তবায়নের জন্য সরকারি উদ্যোগে শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে।

এই পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের কোনো বিষয় আর পূর্বের মত হুবহু মুখস্থ করতে হবে না। শিক্ষার্থীরা কোনো বিষয় বুঝে উপলব্ধি করে তার অর্জিত জ্ঞান প্রযোগ করতে পারবে। যা পরবর্তী জীবনে তাকে তার কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগ করতে সহায়ক হবে। এই পদ্ধতিতে প্রতিটি প্রশ্ন্নের মান থাকে ১০। প্রত্যেকটি প্রশ্ন , , চারটি ভাগে বিভক্ত থাকে। এবং নং প্রশ্নের উত্তর উদ্দীপক ছাড়াই করা যাবে। এখানে উদ্দীপকের সাহায্য প্রয়োজন হবে না। কিন্তু নং প্রশ্নের উত্তরের জন্য উদ্দীপকের সাহায্য নিতে হবে। অংশে থাকে এক নম্বর, অংশে দুই, অংশে তিন এবং অংশে থাকে চার নম্বর।

সৃজনশীল প্রশ্নে একটি উদ্দীপক থাকবে যা একজন শিক্ষার্থীকে প্রশ্নের অনুধাবন ক্ষমতা অর্জনে সহায়ক হবে। প্রশ্নের অংশ হলো জ্ঞানমূলক। যার উত্তর একজন শিক্ষার্থী খুব সহজেই করতে পারবে। অংশে থাকবে অনুধাবনমূলক প্রশ্ন। যা একজন শিক্ষার্থী সামগ্রিক অবস্থা অনুধাবন করে অর্থাত্ বুঝে লিখতে পারবে। অংশে থাকবে প্রয়োগমূলক প্রশ্ন। আলোচনার সুবিধার্তে বলা যায়, প্রয়োগমূলক অংশের নম্বরের মধ্যে শিক্ষার্থীর আলোচনা যদি জ্ঞানমূলক পর্যায়ে থাকে তাহলে সে ক্ষেত্রে তাকে নম্বর দেয়া যেতে পারে। আর যদি তার আলোচনা অনুধাবনমূলক হয় তাহলে তাকে নম্বর দেয়া যাবে। আর যদি শিক্ষার্থীর অংশের আলোচনায় জ্ঞানমূলক, অনুধাবন প্রয়োগমূলক দিক থাকে তাহলে তাকে নম্বর দেয়া যাবে। এভাবে একজন শিক্ষার্থীকে যে কোনো প্রশ্ন বুঝে তার জ্ঞানমূলক, অনুধাবনমূলক প্রয়োগমূলক দিক উপস্থাপন করতে হবে। অনুরূপভাবে উচ্চতর দক্ষতা যাচাই অংশে তার আলোচনা যদি জ্ঞানমূলক, অনুধাবন, প্রয়োগমূলক উচ্চতর দক্ষতা যাচাই করে তাহলে তাকে নম্বর দেয়া যাবে। এই দিকগুলো গুরুত্বসহকারে দেখলে একজন শিক্ষার্থীর পক্ষে গদ বাঁধা ছক মুখস্থ না করে খুব সহজেই ভালো ফলাফল করা সম্ভব হবে

তথ্যসূত্র: www.amarblog.com
 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন