শনিবার, ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪

সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতির প্রয়োগ কেবল গবেষণার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য



সৃজনশীল হওয়া ছেলেখেলা নয় এবং সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতি কোমলমতি শিশু-কিশোরদের জ্ঞানলাভে প্রয়োগ করা হলে তাদের সৃজনশীলতা অঙ্কুরেই নষ্ট করা হবে, সৃজনশীল হওয়ার পথ সুগম না করে রুদ্ধ করা হবে। এতে ইউরোপের মতো কবি-বিজ্ঞানীর সংখ্যা দেশে বৃদ্ধি না হয়ে জাতির সর্বনাশ অনিবার্য
সমন্বিত শিক্ষাপদ্ধতির কুফলের মতো সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতির কুফল নিয়ে ভাবতে হবে অভিভাবক মহল, বিদগ্ধ সমাজ সুধীমহলকে। সর্বোপরি নোট-গাইড কোচিং শিক্ষাদানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর যাবতীয় সমস্যার সমাধান যে পদ্ধতি করে দিচ্ছে তাকে আর যাই বলুন, সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতি বলতে পারেন না। পদ্ধতিকে শিশু-কিশোরের স্বাধীন মনোবিকাশ বাধাগ্রস্ত রুদ্ধ করে দেয়ার একটা ক্ষতিকর শিক্ষাদান পদ্ধতি বলতে পারেন
সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতির প্রয়োগ কেবল গবেষণার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। শিশু-কিশোরদের শিক্ষাদানে সৃজনশীল পদ্ধতির প্রয়োগ ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে সৃজনশীল না করে তার সৃজনশীল প্রতিভা বিকাশকে করে দেবে রুদ্ধ, জাতিকে করবে পঙ্গু। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের হোতা হিটলার তারডধত্নামক গ্রন্থে বলেছেন, ‘কোনো দেশের ওপর অ্যাটমবোমা বিস্ফোরণের ফলে যে ক্ষতি হবে, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি হবে যদি সে দেশের মানুষের স্বদেশ প্রেম, কাজের স্পৃহা, চরিত্র, শিক্ষা নৈতিকতাএই পাঁচটি জিনিস নষ্ট করে দেয়া যায়।দাতাগোষ্ঠী বিশেষত মার্কিন মোড়ল এই পাঁচটি বিষয়কে সামনে রেখেই আমাদের এমনভাবে সাহায্য দেয়, যাতে এই পঞ্চশক্তিকে পঙ্গু করে দিতে পারে এবং আমাদের উন্নতির পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। তখন দেশটি কেবল তাদের শিল্পপতি ব্যবসায়ীদের পণ্য বিক্রিরপণ্যবাজারবলে গণ্য হবে
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এককালের চেয়ারম্যান অধ্যাপক . হুমায়ুন আজাদ বলেছেন, ‘আমাদের দেশের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে আজও ঊনবিংশ শতকের পুরনো জ্ঞানের জাবরকাটা হচ্ছে।অতএব আমরা দেখতে পাই, আমাদের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্জিত জ্ঞান ডিগ্রি বিদেশে বিশেষত ইউরোপ-আমেরিকার কোনো দেশে প্রশংসা পাওয়া তো দূরে থাক, গ্রহণযোগ্যতাও পায়নি। মহাকালের মহাবিজ্ঞানী স্টিফেন ডব্লিউ হকিং বলেছেন, ‘জ্ঞানের বিকাশ এত দ্রুত ঘটছে যে, আমাদের স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে যা পড়ানো হয় তা সেকেলে।মহাবিজ্ঞানী হকিংয়ের উদ্ধৃতি থেকে আমরা উপলব্ধি করতে পারি, জ্ঞান আহরণের ক্ষেত্রে আমরা আরও কত পিছনে পড়ে আছি। বিশ্বের যেসব শিক্ষালয়ে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি করা হয়, সেগুলোকে বিশ্ববিদ্যালয় বলা হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে আমাদের দেশের কটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রকৃতপক্ষে বিশ্ববিদ্যালয় বলে গণ্য হবে? আমাদের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গবেষণার হার বিদেশের যে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে নগণ্য। আর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় গবেষণার সুযোগ নেই বললেই চলে। বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গবেষণার সুবাদে তাদের নিজ দেশের সমস্যা সমাধান করছে এবং মানবজাতির কল্যাণে নতুন জ্ঞান সৃষ্টির মাধ্যমে আবিষ্কার-উদ্ভাবন করে মানবজাতির হিতসাধন তথা মানব সভ্যতা বিকশিত করছে। ব্যাপারে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবদান নগণ্য
আশ্চর্যের বিষয় হলোযে সৃজনশীল পদ্ধতি কোনো বিষয়ে বিশেষজ্ঞ ব্যক্তি বা বহুমুখী জ্ঞানের অধিকারীরা গবেষণাকাজে ব্যবহার করে নতুন জ্ঞান সৃষ্টি বা কিছু আবিষ্কার করেন, সেই জটিল পদ্ধতিটি আমাদের দেশের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদান শিক্ষাগ্রহণে প্রয়োগ করা হচ্ছে; বাস্তবে তা হিতকর নয়, অহিতকর। আমাদের দেশের স্কুল-কলেজের কোমলমতি শিশু-কিশোররা যথাযথ জ্ঞানলাভের আগেই কিছু সৃষ্টি করার দায়িত্ব বহন করছে সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতিতে জ্ঞান আহরণ করার কারণে। সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতি শিক্ষার্থীর শিক্ষণে এবং ভবিষ্যতে যেসব শিশু-কিশোর সৃজনশীল হওয়ার সম্ভাবনা আছে, তাদের সৃজনশীল মনের বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করছে। কেননা শেখার আগে কেউই সৃজনশীল হয় না। জ্ঞান আহরণের আগে শিক্ষার্থীকে সৃজনশীল বানানোর প্রক্রিয়া প্রচেষ্টা তার শিক্ষাজীবনকে ব্যর্থ করে দিতে পারে। কেউ গান গাইতে গাইতে যেমন গায়ক হয় তেমনি বই পড়তে পড়তে এবং শিখতে শিখতে একদিন হয়ে যায় সৃজনশীল বা সৃষ্টিশীল। সৃজনশীলতার জন্য যার যা ভালো লাগে, যা মনে আনন্দ দেয় তা স্বাধীনভাবে শিখতে হবে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে বেঁধে দেয়া সিলেবাসনির্ভর পাঠ্যপুস্তক পড়ে কারো সৃজনশীল হওয়ার নজির নেই। জীবনের অভিজ্ঞতা, রকমারি বইপড়া, ভাষাজ্ঞানে দক্ষতা স্বাধীন ভাবনা-চিন্তা মানুষকে করতে পারে সৃজনশীল। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকের সীমিত জ্ঞান কিংবা কোনো পদ্ধতি বা সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতি শিক্ষার্থীকে সৃজনশীল বানাতে পারে না
অধ্যাপক হকিং এবং অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ কেন বলেছেন, বিশ্বজুড়ে স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পুরনো জ্ঞান শিক্ষার্থীদের শেখানো হচ্ছে? কারণ বিশ্বজুড়ে নতুন জ্ঞান বোঝার মতো শিক্ষকের অভাব। আর আমাদের দেশে এই অভাব আরও প্রকট। বিশ্বের তাবত্ কবি-সাহিত্যিক-দার্শনিক-লেখক-বিজ্ঞানী সৃষ্টিশীল কাজ বাস্তবায়নে সৃজনশীল শিক্ষণ পদ্ধতি প্রয়োগ করেন। বস্তুত সৃজনশীল শিক্ষাপদ্ধতি কোমলমতি শিক্ষার্থীদের করবে সৃজনহীন। একজন সত্ মানুষ যেমন একজন সত্ মানুষ সৃষ্টি করেন, তেমনি একজন ভালো শিক্ষক ভালো ছাত্র সৃষ্টি করতে পারেন। অনুরূপভাবে একজন সৃজনশীল শিক্ষক একজন সৃজনশীল ছাত্র বানাতে পারেন
তথ্যসূত্র: http://m.dailybartoman.com

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন